অর্থনীতি ডেস্ক: ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সামরিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে, যার ফলে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানির দাম। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা পর্যায়ে তেলের গড় দাম চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন চার ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি তেলের মূল্য ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের সময় জ্বালানির বাজারে এমন ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১১২ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই ক্রুড অয়েলের দামের চিত্র ছিল বেশ অস্থির। দিনের বিভিন্ন সময়ে দাম ওঠানামা করলেও শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের বাড়তি দামেই তেল কিনতে হচ্ছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বাজারের এই বাড়তি মূল্য মূলত বড় ধরনের ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ বা ঝুঁকি ভাতার কারণে ঘটছে। এই পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না।
জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ট্যাংকার ভাড়ার রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলবাহী ট্যাংকারগুলো বিক্রির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা কিছুটা বাড়বে এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে এর মাধ্যমে ঠিক কতটা সুফল মিলবে বা সাধারণ মানুষ কত দ্রুত স্বস্তি পাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না বাজার বিশ্লেষকরা। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও পরিশোধিত পণ্যের জোগান এখনো বেশ সীমিত রয়েছে।
শুধু তেল নয়, এর পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দামও বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এশিয়ার বাজারে এলএনজির স্পট দর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। ইয়েমেন উপকূলে একটি এলএনজি ট্যাংকারে হামলার ঘটনার পর এই অঞ্চলের জলসীমায় পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। ইউরোপের বাজারগুলোতেও গ্যাসের দাম রেকর্ড উচ্চতায় অবস্থান করছে, যা সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৈশ্বিক এই জ্বালানি সংকট কতদিন স্থায়ী হবে এবং এর অর্থনৈতিক অভিঘাত কতটা মারাত্মক হবে, তা নিয়ে এখন থেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply