শিক্ষা ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে সামনে রেখে ১৯৭৪ সালে প্রণীত ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ২০১০ সালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার প্রফেসর কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে সেই রিপোর্টের আদলেই নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। মূলত সত্তরের দশকের ওই শিক্ষা কমিশনের অনেক সুপারিশই নতুন সংস্করণে হুবহু অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা সে সময় দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল।
১৯৭৪ সালের ওই কমিশনে প্রাথমিক স্তর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল এবং ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতেও একই ধারা অনুসরণের চেষ্টা করা হয়। এর ফলে অবকাঠামোগত নানা জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি, মাদরাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয় এবং সাধারণ শিক্ষার সিলেবাস বাধ্যতামূলক করায় শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়।
কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের সুপারিশে প্রাথমিক স্তরে সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বইয়ের পরিবর্তে একটি সমন্বিত নীতিশিক্ষা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক সমাজ গঠনের কথা বলা হলেও, ধর্মপ্রাণ মানুষের মতে এতে ধর্মীয় শিক্ষাকে নানাভাবে সংকুচিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অধীনে পরিচালিত করার বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা নিয়ে সমাজে দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলে পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক বন্দনা ও একপক্ষীয় ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নানা অনিয়মের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতের সংস্কারে কমিশন গঠন করলেও শিক্ষা খাতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো বড় উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে পাঠ্যবইয়ে কিছু বাহ্যিক পরিবর্তন আনা হলেও সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য এখনও বড় ধরনের সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply