জাতীয় ডেস্ক: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত পাহাড়ি ছড়াগুলো স্থানীয় প্রকৃতি ও পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলেও বর্তমানে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে চরম বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সরকারিভাবে মাত্র দুটি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়াসহ অন্তত ২৬টি স্থান থেকে সিলিকা বালু অবৈধভাবে তুলে নেওয়া হচ্ছে। দিনের পর দিন চলা এই অপরিকল্পিত উত্তোলনের ফলে এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার অভিযোগ করলেও থামানো যাচ্ছে না এই ধ্বংসযজ্ঞ। সদরসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ছড়াগুলো থেকে নির্বিচারে বালু তোলার কারণে নদীনালার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে বহুমুখী সংকট।
পরিবেশকর্মীদের মতে, পাহাড়ি ছড়া থেকে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বালু তোলার ফলে ছড়ার তলদেশের গঠন ও পানির প্রবাহে মারাত্মক পরিবর্তন আসছে। এর ফলে তীব্র তীরভাঙন, কৃষিজমির ক্ষয়, সড়ক ও সেতুর ভিত্তি দুর্বল হওয়া এবং বসতবাড়িগুলো নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও বালু খেকোদের থামানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জরিমানা, কারাদণ্ড ও বালু জব্দের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও চক্রগুলো সামান্য জরিমানা দিয়ে আবারও অবৈধ ব্যবসায় লিপ্ত হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট থেকে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৮টি অভিযান পরিচালনা করে কিছু জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এর সুফল দেখা যাচ্ছে না, কারণ অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই প্রভাবশালী চক্রগুলো পুনরায় বালু উত্তোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
অবৈধভাবে বালু পরিবহন ও উত্তোলনের ফলে শুধু পরিবেশই নষ্ট হচ্ছে না, বরং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। সম্প্রতি বালুবাহী একটি গাড়ির চাপায় চালকসহ বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। উত্তেজিত জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দীর্ঘ সময় সড়ক অবরোধ করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হস্তক্ষেপ করতে হয়। এমনকি এই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীদেরও হামলার শিকার হতে হয়, যা অবৈধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের স্পষ্ট প্রমাণ। এর আগে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে স্থানীয় প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে দাবি করেছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষিজমি সুরক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ আইন অমান্য করে অবৈধভাবে বালু তোলার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সুরে উপজেলা সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, জনস্বার্থে ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের এই তৎপরতা থামবে না। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল মাঝেমধ্যে অভিযান বা সামান্য জরিমানা করে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ।
Leave a Reply