শিক্ষা ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রায় সব শিশুর বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী দেশের বয়স ১০ বছর এমন প্রায় অর্ধেক শিশু সাধারণ ও সহজ কোনো লেখা পড়ে তার সঠিক অর্থ অনুধাবন করতে অক্ষম। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষার এই দুর্বলতাকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মেধার সঠিক বিকাশ ব্যাহত করছে। মালয়েশিয়া কিংবা ব্রাজিলের মতো সমকক্ষ বা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশগুলোর তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক দক্ষতায় বাংলাদেশ এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। অথচ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপযোগী দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলার মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা।
শিক্ষার এই বেহাল দশা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রায় তিন হাজার ৭২০ কোটি টাকা বা ৩০ কোটি ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে এই ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে যার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে পঁচিশ বছর এবং প্রথম পাঁচ বছর ঋণ পরিশোধে বিশেষ ছাড় বা গ্রেস পিরিয়ড মিলবে। লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকসেলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন প্রোগ্রাম শীর্ষক এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ শিশুর পড়ালেখা ও গণিতে মৌলিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। সরকারের চলমান পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও এই অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিশাল বাজেটের অর্থ মূলত শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা এবং গাণিতিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ শিক্ষা প্যাকেজ চালুর পেছনে ব্যয় করা হবে। এর আওতায় আকর্ষণীয় পাঠদান উপকরণ সরবরাহ, সুনির্দিষ্ট পাঠপরিকল্পনা তৈরি এবং শিক্ষকদের আধুনিক ও কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় তুলনামূলক বেশি পিছিয়ে রয়েছে, সেসব এলাকায় বাড়তি মনোযোগ ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাসের বাইরে পড়াশোনায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিংহভাগ প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নেতৃত্বের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে যাতে সার্বিক পরিবেশ উন্নত হয়।
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করার মাধ্যমে শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়ার হার কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থায় আট লাখেরও বেশি নতুন ও উন্নত বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষার ভিত ছাড়া ভবিষ্যতে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা অসম্ভব। কোনো শিশুই যেন পিছিয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার এবং সঠিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
Leave a Reply