অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের সব স্তরের মানুষকে ডিজিটাল আর্থিক সেবার আওতায় আনতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে আগামী নভেম্বর মাস থেকে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির সরাসরি লেনদেন ব্যবস্থা চালু করা হবে। এই পদ্ধতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে রিকশাচালক ও মুচির মতো প্রান্তিক পেশাজীবীরাও খুব সহজেই নিজস্ব কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন। সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি পরিশোধ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এই তথ্য জানান। ওয়ান ব্যাংক পিএলসি এবং ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে গভর্নর জানান যে, বাংলা কিউআর কোড চালুর প্রক্রিয়াটি মোট চার ধাপে সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই কর্মপরিকল্পনার প্রথম ধাপে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক নির্দেশনাগুলো জারি করা হয় এবং গত ১ জুলাই থেকে তা সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে এই প্রযুক্তির কার্যক্ষমতা ও সক্ষমতা নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়। আন্তঃসংযোগভিত্তিক এই লেনদেন ব্যবস্থায় একসঙ্গে অনেক বেশি লেনদেন সামাল দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশের নিজস্ব ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা এনপিএসবি ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ প্রতি সেকেন্ডে তিনশ লেনদেন সম্পন্ন করার সক্ষমতা সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে।
গভর্নর আরও জানান যে, প্রায় একশটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে এই আন্তঃসংযোগ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শুরুতে হঠাৎ করে এটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হলে এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে কিছু উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে মাত্র দেড় থেকে দুই মাসের ব্যবধানে এই কার্যক্ষমতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সন্তোষজনক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এছাড়া, গত ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সকল চার্জ সম্পূর্ণ অবৈতনিক বা শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
লেনদেন চার্জ প্রসঙ্গে গভর্নর স্পষ্ট করেন যে, দুই হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত যেকোনো অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরে কোনো ধরনের চার্জ কাটা হবে না। এই ব্যবস্থার ফলে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে গেছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান যে, গত জুনের প্রথম সপ্তাহে এই ব্যবস্থায় দৈনিক গড় লেনদেন ছিল মাত্র ৩৭ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বেড়ে প্রায় ১৮০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে লেনদেনের পরিমাণ চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই অর্জনকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে না দেখে দৈনিক প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার লেনদেন নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলা কিউআর ব্যবস্থার এই অভাবনীয় সাফল্য এখন শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ আগ্রহ তৈরি করেছে। গভর্নর জানান যে, গুগল, মেটা ও হুয়াওয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা কালেও এই সেবা সম্পর্কে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসে এই কার্যক্রমের চতুর্থ তথা চূড়ান্ত ধাপের সূচনা হবে। এই ধাপে একজন সাধারণ নাগরিক দেশের যেকোনো প্রান্তে অন্য আরেকটি নির্দিষ্ট কিউআর কোড স্ক্যান করে খুব সহজেই নগদ অর্থের ঝুট ঝামেলা ছাড়া টাকা পাঠাতে পারবেন।
Leave a Reply