জাতীয় ডেস্ক: কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে জর্জরিত রয়েছে। কোমলমতি শিশুরা যখন শিক্ষার আলো নিতে বিদ্যালয়ে যায়, তখন তাদের কাটাতে হয় চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। অধিকাংশ সময় শ্রেণিকক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার ভয়ে তটস্থ থাকে শিক্ষার্থীরা। জরাজীর্ণ এসব ভবনের ছাদের পলেস্তারা ধসে পড়ে ভেতরের মরিচা ধরা রডগুলো বেরিয়ে পড়েছে, যা শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে চরম হুমকিতে ফেলে দিয়েছে। এই দুরবস্থার কারণে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মনেও শঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন বেহাল দশা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে মোট ২১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে নির্মিত তিন কক্ষবিশিষ্ট বহু ভবন এখন ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, উপজেলার প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বিদ্যালয়ে নতুন কোনো ভবন নির্মাণ করা হয়নি এবং পুরোনো অবকাঠামোগুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক স্থানে জরাজীর্ণ ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিকল্প টিনশেড ঘরে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে পাঠদান চালু রাখা হয়েছে। কিন্তু এই বিকল্প ব্যবস্থাও প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল এবং অস্বস্তিকর।
মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক ও শোচনীয়। উদাহরণস্বরূপ, চর আমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল ভবনের ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাধ্য হয়ে একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে, পিপুলবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে জায়গা না পেয়ে সিঁড়ির নিচের ছোট অংশকে অফিসকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, ক্লাসের সময় প্রায়ই ছাদ থেকে সুরকি ও পলেস্তারা খসে পড়ে। এ কারণে তারা সব সময় বড় কোনো দুর্ঘটনার ভয়ে আতঙ্কিত থাকে এবং ঠিকমতো পড়াশোনায় মন দিতে পারে না।
ভবন সংকটের পাশাপাশি কিছু বিদ্যালয়ে দেখা গেছে তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকট। তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কক্ষের অভাবে একটিমাত্র ঘরের মাঝখানে কাপড়ের পর্দা ঝুলিয়ে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেই পর্দার দুই পাশে একসঙ্গে দুটি ভিন্ন শ্রেণির পাঠদান চালানো হয়। শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে এই পদ্ধতিতে ক্লাস নিলেও পাশের শ্রেণির কোলাহলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়। বিদ্যালয়টির শিক্ষকরা জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের এই নজিরবিহীন পথ বেছে নিতে হয়েছে এবং দ্রুত নতুন ভবন বরাদ্দ না পেলে শিক্ষার মান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাক আহম্মেদ এই সার্বিক সংকটের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো ভবনগুলোর তালিকা তৈরি করে ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পিডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং নতুন করে পিডিপি-৫ এর কার্যক্রম শুরু হলে সমস্যার সমাধান মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এসব জরাজীর্ণ ভবনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং শিক্ষার্থীরা একটি সুন্দর ও নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন ফিরে পাবে।
Leave a Reply