অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের বৈষম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী দেশের সব এলাকায় ব্যাংকিং সেবার বিস্তার ও সুযোগ সমানভাবে হয়নি। কোথাও প্রচুর পরিমাণে আমানত জমা ও ঋণ বিতরণ হলেও অনেক অঞ্চলে এর চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। ব্যাংকিং খাতের এই অসম অবস্থার কারণে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার এবং নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথও সংকুচিত হয়ে পড়ছে যা দীর্ঘমেয়াদে সুষম উন্নয়নের অন্তরায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট আমানতের অর্ধেকের বেশি এবং প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ঋণ ঢাকা বিভাগেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগকে যুক্ত করলে দেখা যায় দেশের সিংহভাগ আর্থিক লেনদেন ও পুঁজি এই দুই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে ময়মনসিংহ বিভাগে মোট আমানতের অত্যন্ত নজিরবিহীনভাবে কম অংশ জমা রয়েছে। এছাড়া সিলেট অঞ্চলে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণও দেশের মোট ঋণের তুলনায় নামমাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুন প্রান্তিকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের বিশাল একটি অংশ একাই দখল করে আছে ঢাকা বিভাগ। এর আগের প্রান্তিকের তুলনায় এই অঞ্চলে আমানতের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে যার বড় একটি অংশ এসেছে শহরাঞ্চল থেকে। একইভাবে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের স্থিতি পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় সিংহভাগ অর্থই ঢাকা অঞ্চলের বিভিন্ন খাতে বিতরণ করা হয়েছে। অন্য বিভাগগুলো এক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবধানে পিছিয়ে রয়েছে যা সারা দেশের আর্থিক খাতের ভারসাম্যহীনতাকে নির্দেশ করে।
আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণ উভয় ক্ষেত্রেই ঢাকার পরেই অবস্থান করছে চট্টগ্রাম বিভাগ। এই দুই বিভাগ মিলিয়ে দেশের মোট আমানতের সিংহভাগ এবং প্রায় সতেরো ভাগের কাছাকাছি ঋণ কুক্ষিগত করে রেখেছে। এর বিপরীতে খুলনা রাজশাহী সিলেট এবং ময়মনসিংহের মতো বিভাগগুলোর আর্থিক চিত্র অত্যন্ত ম্লান। বিশেষ করে সিলেটে আমানত কিছুটা থাকলেও ঋণ বিতরণের হার অত্যন্ত কম যা ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রমাণ দেয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং করপোরেট অফিসগুলো নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকায় এই বৈষম্য দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন অর্থনৈতিক কার্যক্রম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ার কারণেই দেশে এই ভারসাম্যহীন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থানের খোঁজে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত বড় শহরগুলোতে ভিড় করছে ফলে রাজধানী ও এর আশপাশে চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দেশের প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের প্রসারে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করা না গেলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে না।
Leave a Reply