রফিকুল ইসলামের (৫৫) সেই ১০ বছর আগের জীবনের সঙ্গে এখন আর কোনো মিলই নেই। ওই সময় তাঁর বসতভিটা ছাড়া কোনো জমি ছিল না। অন্যের জমিতে দিনমজুরি খেটে কোনো রকমে চলত তাঁর সংসার। এক বেলা খাবার জুটল তো, অন্য বেলায় জুটত না। স্ত্রী–সন্তান নিয়ে প্রায়ই তাঁকে উপোস থাকতে হতো। সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে আজ তিনি সফল চাষি। আজ তাঁর জমি, বাড়ি সবই আছে। রফিকুল ইসলামের ভাগ্যের চাকা মূলত বদলে গেছে সবজি চাষে। তাঁর বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার কাবিলপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামে। তিনি এখন এলাকার অনেক সবজিচাষির পথপ্রদর্শক।পীরগঞ্জ উপজেলা থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে কৃষ্ণপুর গ্রাম। ওই গ্রামে রফিকুল ইসলামের বাড়ি। ফসল ভালো হতো না বলে একসময় অভাব লেগেই থাকত গ্রামটিতে। এক ফসলি উঁচু জমি ছিল গ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা। এখন গ্রামটির ৯৫ ভাগ মানুষই সারা বছর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নানা রকম সবজির চাষ করেন। খেতগুলো সব সময় শসা, করলা, পটোলসহ নানা রকম শাকসবজিতে ভরে থাকে। ফলনও ভালো। এখানকার সবজি ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।গত শুক্রবার গ্রামটিতে ঢুকেই চোখে পড়ে মাঠের পর মাঠ সবজিখেত। কেউ খেত থেকে শসা, পটোল, করলা তুলছেন, কেউ করছেন পরিচর্যা। বেশির ভাগ বাড়িতে চকচক করছে টিনের চালা। আধা পাকা বাড়িও আছে কয়েকটি।রফিকুল ইসলামের বাড়িতে পৌঁছে দেখি সুনসান অবস্থা। কেউ নেই। খটকা লাগে। কিছুটা হতাশও হই। তাঁকে খোঁজ করতে থাকলে একজন দেখিয়ে দেন, ওই যে রফিকুল সবজিখেতে কাজ করছেন। কিছু দূর এগোতেই দেখা যায়, নিজের করলাখেত পরিচর্যা করছেন তিনি। পরিচয় জেনে জমি থেকে আলে উঠে আসেন। শোনান নিজের ভাগ্য ও গ্রাম বদলে দেওয়ার গল্প। ১৯৭০ সালে তাঁর জন্ম। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবা আমির উদ্দিনের অভাবের সংসার, তাই লেখাপড়া করা হয়নি। কাজ পেলে খাবার জুটত, না পেলে অনাহারে থাকতে হতো। তাঁর কষ্টের কথা শুনে মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক সাইফুল ইসলাম ২০১৪ সালে কিছু করলার বীজ তাঁর হাতে দিয়ে জমিতে লাগানোর পরামর্শ দেন। এ বীজ রফিকুল ৭ শতক বসতভিটার চারদিকে লাগান। ৬০ দিনের মাথায় করলা ধরে। বিক্রি করে আয়ও হয় ৫ হাজার ৮০০ টাকা। এরপর পুরোপুরি করলা চাষে লেগে পড়েনতিনি। প্রথম বছরের লাভের টাকা দিয়ে পরের বছরে অন্যের ২০ শতক জমি বর্গা নেন। এবারও তাঁর করলার ফলন ভালো হয়। বসতভিটাসহ ২৭ শতক জমির করলা বিক্রি করে আয় করেন ১৮ হাজার টাকা। করলার পাশাপাশি পটোল, শসা ও লাউয়ের চাষ শুরু করেন।এভাবে একপর্যায়ে চাষের জমি বাড়ে, আয় বাড়ে। দিনমজুর থেকে রফিকুল ইসলাম হয়ে ওঠেন সফল সবজিচাষি। কেনেন ১৮ শতক জমি, বানান টিনের বাড়ি। তাঁর দুই সন্তান রশিদুল ইসলাম ও রাশিদুল ইসলামও সবজির চাষ করছেন। স্ত্রী রশিদা বেগম রফিকুল ইসলামের সবজি চাষে সহায়তা করছেন। এবার ৫০ শতকে করলা, ২০ শতকে শসা, ১০ শতকে পটোল চাষ করেছেন। ইতিমধ্যে ৭০ হাজার টাকার সবজি বিক্রিও করেছেন। এখনো খেতে যে পরিমাণ সবজি আছে, তা বিক্রি করলে আয় হবে আরও দেড় লাখ টাকার বেশি।
Leave a Reply