
প্রতিবেদনঃ ওমর ফারুক
রাজধানীতে কিছুদিন পর পরই ঘটছে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে নগরবাসী। আন্ডারওয়ার্ল্ডেও নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর কারাগারে থাকা পাঁচ শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে আসার পর রাজধানীতে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো চাঁদাবাজি ও খুনাখুনিতে জড়াচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।
এ ছাড়া রাজধানীর বাইরেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যেই প্রমাণ মিলছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছিল তিন হাজার ২৩টি। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৪৪২টিতে। আর গত বছর তা তিন হাজার ৭৮৬টিতে পৌঁছায়।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি থেকে মার্চ) রাজধানীতে ৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি এবং মার্চে ২৪টি খুনের ঘটনা ঘটে। এপ্রিলের প্রথম ২৮ দিনেই অন্তত ১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে ৩১৭টি হত্যা মামলা হয়। চলতি মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যা করা হয়। এই ক্রমবর্ধমান খুনের ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক দশাকেই তুলে ধরছে বলে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, টিটন গত মঙ্গলবার রাতে আজিমপুরের দিক থেকে নিউমার্কেটের দিকে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলেন।
এ সময় পেছন দিক থেকে মাস্ক পরা এক সন্ত্রাসী গিয়ে তাকে লক্ষ্য করে প্রথমে দুটি গুলি ছোড়ে। পরে আবার দৌড়ে তার কাছে গিয়ে আরও দুটি গুলি করে। এতে তিনি পড়ে যান। পরে আবার তার সামনে গিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। এ সময় লোকজন চিৎকার দিলে ওই দুর্বৃত্ত আরেকটি ফাঁকা গুলি করে দৌড়ে গিয়ে অপেক্ষায় থাকা সঙ্গীর মোটরসাইকেলের পেছনে বসে। এরপর তারা সামনের দিকে চলে যায়।
এ সময় রাস্তা দিয়ে অনেক মানুষ চলাচল করছিল। প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা দেখে তারা দিগ্বিদিক দৌড়াতে শুরু করে। একই রকম দৃশ্য দেখা যায় গত বছর ১০ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সামনে। সেখানে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় সন্ত্রাসী তারিক সাইদ মামুনকে। সেখানে দুজন মাস্ক পরা ব্যক্তি খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে হত্যা করে। কয়েক শ মানুষের মধ্য থেকে মামুনের পিছু নিয়ে গুলি করতে থাকে সন্ত্রাসীরা। এমন ভয়ংকর ঘটনার পর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের সিটি পেট্রল পাম্প ও বিজি প্রেসের মাঝামাঝি এলাকার মূল সড়কে যানজটে আটকে ছিলেন সেই মামুন। ওই দিন ১০-১২ জনের একটি দল প্রকাশ্যে ভিড়ের মধ্যে মামুনের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি শুরু করে। একপর্যায়ে মামুন গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন তাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। মামুন তখন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে তাকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলিতে ভুবন চন্দ্র শীল নামে একজন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। এভাবেই রাজধানীতে ঘটে চলেছে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড।
গত বছরের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীকেও রাজধানীর বুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। অনেক হত্যাকারী আবার নির্বিঘ্নে দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ারও সুযোগ পাচ্ছে। ওসমান হাদীর দুই হত্যাকারী ভারতে গ্রেপ্তারের পর এ চিত্র সামনে এসেছে।
পুলিশ অবশ্য বলছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ জন্য পুলিশের নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ সজাগ রয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনাগুলো সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে ঘটছে, যেখানে সাধারণ মানুষের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘সম্প্রতি দেশে গুলি করে হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব ঘটনায় হতাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু মানুষ যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তখন তারা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গুলির ঘটনা শুধু অপরাধ নয়, এটি সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ায়। তাই দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।’
সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের কারাগারগুলো থেকে অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে যান। এদের মধ্যে কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন এবং খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুর নাম উল্লেখযোগ্য। জেল থেকে বেরিয়েই তারা পুরনো আধিপত্য ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। জেল থেকে যারা বেরিয়ে এসেছে তাদের মধ্যে গত মঙ্গলবার রাজধানীতে খুন হলো টিটন।
Leave a Reply