
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে নাড়ির টানে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। প্রতিবছর ঈদযাত্রা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জনসমুদ্র, ট্রেনের ছাদে উপচে পড়া ভিড় আর মহাসড়কে মাইলের পর মাইল স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের সারি। তবে এবারের কোরবানির ঈদের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চিরচেনা সেই ভোগান্তি আর তীব্র যানজটের পরিবর্তে এবার এক অভূতপূর্ব স্বস্তি ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে রাজধানী ছাড়ছেন মানুষ। সড়ক, রেল কিংবা নৌপথ-সবখানেই এবার বইছে স্বস্তির সুবাতাস। সব মিলিয়ে পথে পথে যেন চলছে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরার উৎসব।
রোববার (২৪ মে) সকাল থেকেই ঢাকার প্রধান রেল প্রবেশদ্বার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এবং কোরবানির উৎসবে শামিল হতে স্টেশনে ভিড় জমান হাজারো যাত্রী।
তবে এই উপচেপড়া ভিড়েও ছিল না কোনো বিশৃঙ্খলা বা চিরচেনা ভোগান্তি। দু-একটি ট্রেন সামান্য বিলম্বে ছাড়লেও যাত্রীদের চোখে-মুখে ক্লান্তির চেয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দই ছিল প্রধান।
এবারের ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় ও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে ট্রেনের ছাদে। অতীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে চড়ে বাড়ি ফেরার যে বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যেত, এবার তা কঠোরভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
ট্রেনের ছাদে যেন কেউ উঠতে না পারে, সেজন্য রেল কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে। নিরাপত্তারক্ষীদের ট্রেনের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত সতর্ক পাহারা দিতে দেখা গেছে।
স্টেশনে অপেক্ষমাণ বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, গত ঈদে বাড়ি ফিরতে পারিনি। তবে এবার কোরবানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিবার নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছি। স্টেশনে এসে দেখলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকেও ট্রেন ব্যবস্থাপনা আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। বিশেষ করে ট্রেনের ছাদে কেউ যেন উঠতে না পারে, সে জন্য রেল কর্তৃপক্ষের নজরদারি সত্যিই প্রশংসনীয়।
এদিকে রোববার সকালে কমলাপুর রেলস্টেশনের সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনে আসেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি স্টেশনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ঘুরে দেখেন এবং সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে খোঁজখবর নেন।
পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের রেলমন্ত্রী জানান, সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রাকে আরও সহজ করতে সোমবার থেকে রেলের বহরে যুক্ত হচ্ছে আরও ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেন। এই বিশেষ ট্রেনগুলো চালু হলে যাত্রীদের যাতায়াত আরও বেশি স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
রেলপথের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল এবং লঞ্চঘাটগুলোতেও যাত্রীদের উপচে পড়া চাপ লক্ষ্য করা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পর্যাপ্ত যানবাহন ও বিশেষ ট্রেনের সুব্যবস্থা থাকায় এবারের যাত্রাপথ বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিক।
সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর এসেছে দেশের মহাসড়কগুলো থেকে। বিগত বছরগুলোতে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হতো, এবার সেখানে বড় কোনো যানজটের খবর মেলেনি। ফলে নির্বিঘ্নে ও সঠিক সময়েই দূরপাল্লার গাড়িগুলো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে।
বিগত কয়েক বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এবারের এই সুশৃঙ্খল ঈদযাত্রা সাধারণ মানুষের পথের ক্লান্তি দূর করে মনে এনে দিয়েছে ঈদের প্রকৃত আনন্দ।
ঘরমুখো যাত্রীরা সন্তোষ প্রকাশ করে বলছেন, দীর্ঘ যানজট ও ভোগান্তি না থাকায় এবার পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বস্তিতে বাড়ি ফেরা সম্ভব হচ্ছে। সব পথ যেন এখন মিশে যাচ্ছে নাড়ির টানে, প্রিয়জনদের হাসিমুখের ঠিকানায়।
Leave a Reply