
পাওনাদারদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করে হয়রানি করতে ‘অপহরণের নাটক’ সাজিয়ে সাড়ে চার বছর আত্মগোপনে থাকার অভিযোগ উঠেছে আঃ মান্নান প্যাদা (৭০) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তাকে মাদারীপুরের কালকিনি থেকে উদ্ধার করেছে পটুয়াখালী জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
পুলিশের দাবি, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে পাওনাদারদের ফাঁসাতে নিজের নিখোঁজের নাটক সাজিয়েছিলেন আঃ মান্নান। এ ঘটনায় তার ছেলে পাওনাদারদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন।
পটুয়াখালী জেলা পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, ২০২২ সালে বরগুনার তালতলী থানাধীন তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে ‘পটুয়াখালী হোটেল’ নামে একটি ভাতের হোটেল থেকে আঃ মান্নান কথিতভাবে নিখোঁজ হন। পরে তার ছেলে মো. জসিম প্যাদা পটুয়াখালী সদর থানায় নিখোঁজের জিডি করেন। একই বছরের ১৪ আগস্ট আদালতে পাওনাদারদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৬৪/৩৬৫/১০৯ ধারায় মামলা করেন তিনি।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক ১টার দিকে মাদারীপুরের কালকিনি থানা এলাকার একটি বেদে পল্লী থেকে আঃ মান্নানকে উদ্ধার করে ডিবি পুলিশের একটি দল।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আঃ মান্নান জানিয়েছেন, ২০২০ সালে তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে ‘পটুয়াখালী হোটেল’ নামে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণকাজে নিয়োজিত দুটি কোম্পানির শ্রমিকরা নিয়মিত ওই হোটেলে খাবার খেতেন। মাস শেষে কোম্পানি দুটির কাছ থেকে খাবারের বিল নেয়া হতো।
পুলিশের ভাষ্য, ওই দুই কোম্পানির কাছে তার প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ও ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা পাওনা ছিল। আত্মগোপনে যাওয়ার আগের রাতে প্রথম কোম্পানির মালিকের বাসায় গিয়ে পাওনা টাকা চাইলে তাকে ৪ লাখ টাকা দেয়া হয়। ওই টাকা থেকে মুদি, মুরগি ও মাছ ব্যবসায়ীদের কিছু পাওনা পরিশোধ করেন তিনি। বাকি টাকা পরিশোধ নিয়ে তাদের সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়।
এর মধ্যে হোটেলের ম্যানেজার মো. নুর আলম সিকদার পাওনাদারদের বাকি টাকা পরিশোধ করবেন বলে জানান। পরে দ্বিতীয় কোম্পানির ম্যানেজারের কাছে পাওনা টাকা চাইলে তিনি জানান, ওই টাকার কিছু অংশ নুর আলমকে দেয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি আঃ মান্নানকে জানানো হয়নি বলে পুলিশের কাছে দাবি করা হয়।
পুলিশের দাবি, এরপর নুর আলমের পরামর্শে কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার সিদ্ধান্ত নেন আঃ মান্নান। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ম্যানেজার দেখাশোনা করবেন এবং তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখবেন, এমন আশ্বাসও দেয়া হয়।
পরে নুর আলমের প্ররোচনায় নিজের অপহরণের নাটক সাজিয়ে প্রথমে নিখোঁজের জিডি এবং পরে আদালতে মামলা করা হয় বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্যমতে, তালতলী থেকে বাসে পটুয়াখালী এবং পরে ঢাকা যান আঃ মান্নান। এরপর ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার কেবলা বাবার মাজার, কুমিল্লার বেলতলা সলেমান ল্যাংটা বাবার মাজার, চট্টগ্রামের মাইজভান্ডার, ঢাকা ও যশোরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেন।
পরে বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজার, বাকেরগঞ্জের বারো আউলিয়ার মাজারসহ বিভিন্ন মাজার ও বেদে পল্লীতে ছদ্মবেশে আত্মগোপনে ছিলেন বলে পুলিশ জানায়।
একপর্যায়ে বরিশালে পরিচিত এক ধর্মের এক নারীর বাসায় এবং পরে মাদারীপুরে তার ভগ্নিপতির বাড়িতে অবস্থান নেন আঃ মান্নান।
পুলিশের দাবি, এ সময় তার ছেলের মাধ্যমে পাওনাদারদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করে তাদের হয়রানি করা হয়।
দীর্ঘ সময় ছদ্মবেশে থাকার কারণে আঃ মান্নানের অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের পর তাকে আদালতে হাজির করা হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পটুয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মামলাটির তদন্ত চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সহযোগীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
Leave a Reply