
কাশিমপুরে মামলা প্রত্যাহারে হুমকি: বাড়িতে হামলা, যুবককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ; ভিকটিম নিখোঁজ
গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুর মহানগরের কাশিমপুরে ধর্ষণ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের জন্য বাদী ও তার পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ বাদিনীর বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর এবং তার ছেলে মোঃ আশিক মোল্লাকে লোহার রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে মারধর করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। একই সঙ্গে অপহৃত তরুণীকে ভারতে পাচার করে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘটনার পরও ভিকটিম আফরিন আক্তার হাবিবা এখনো উদ্ধার হয়নি বলে দাবি পরিবারের।
এ ঘটনায় মোছাঃ আমেনা বেগম (৫৩) গত ২৬ আগস্ট কাশিমপুর থানায় এজাহার রুজুর আবেদন করেছেন। এজাহারে মেহেদী হাসান (২৬), হৃদয় হাসান (২৫), জাহিদুল ইসলাম (৩৬), জাকির (৩৮), মাছুরা খাতুন (৩৫) ও হাফিজুর রহমান (৪৮)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদিনীর মেয়ে আফরিন আক্তার হাবিবা (১৭)-কে ধর্ষণের অভিযোগে ১ নম্বর আসামি মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে কাশিমপুর থানায় মামলা নং-৬(৮)২৪, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় অভিযোগপত্র নং-৮১, তারিখ ৩০ এপ্রিল ২০২৫ দাখিল করা হয়। মামলাটি বর্তমানে গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা নং-৩৮৩/২০২৫ হিসেবে বিচারাধীন রয়েছে।
এজাহারে আমেনা বেগম অভিযোগ করেন, ১ নম্বর আসামি কারামুক্ত হওয়ার পর থেকেই মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি, হুমকি ও মানসিক চাপ দিয়ে আসছিলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ১৮ এপ্রিল ২০২৬ বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে ১ নম্বর আসামি তার মেয়ে আফরিন আক্তার হাবিবাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যান। পরে একই দিন রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তাকে ফেরত দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে গত ২৮ জুন ২০২৬ বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে ১ থেকে ৬ নম্বর আসামিসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জন বাদিনীর বসতবাড়িতে এসে তার মেয়ে আফরিন আক্তার হাবিবাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় এবং আটক করে রাখে বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ৩১ জুলাই ২০২৬ দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে ১ নম্বর আসামি তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকে বাদিনীর মোবাইল ফোনে কল করে ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এ সময় তিনি মামলা প্রত্যাহার করলে হাবিবাকে ফেরত দেওয়া হবে, অন্যথায় তাকে ও তার মেয়েকে হত্যা করে লাশ গুম করা অথবা মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদিনীর অভিযোগ, ৫ ও ৬ নম্বর আসামি মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং তার মেয়েকে অপহরণ ও গুমের ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। এই চক্র ভিকটিমকে ভারতে পাচার করে দিয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে আমেনা বেগম গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নালিশি মামলা দায়ের করেন। এজাহারে বলা হয়েছে, ওই মামলা সি.পি. মামলা নং-২০০/২০২৬, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭/৩০ ধারায় দায়ের করা হয়েছে এবং বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে।
অভিযোগে বলা হয়, নালিশি মামলা দায়েরের বিষয়টি জানতে পেরে আসামিরা বাদী ও তার পরিবারের ওপর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ আগস্ট ২০২৬ রাত আনুমানিক ৩টা ২২ মিনিটে ১ থেকে ৬ নম্বর আসামি এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জন রামদা, লোহার রড, বাঁশের লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাদিনীর বসতবাড়ির উঠানে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে। তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং লাথি মেরে ঘরের দরজার ক্ষতিসাধন করে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে আসামিরা ‘কোর্টে মামলা দিয়েছিস, মামলা তুলবি না?’ বলে ঘরের দুটি থাই গ্লাস ভাঙচুর করে জানালা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সময় ১ নম্বর আসামির নির্দেশে অন্য আসামিরা লোহার রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে বাদিনীর ছেলে মোঃ আশিক মোল্লা (২৬)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ি মারধর করে। এতে তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়। একপর্যায়ে তার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা ঘরে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদিনীর ডাক-চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা মামলা প্রত্যাহার না করলে আশিক মোল্লাকে হত্যা এবং অপহৃত আফরিন আক্তার হাবিবাকে ভারতে পাচার করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আহত আশিক মোল্লাকে উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুরে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার চিকিৎসা দেওয়া হয়। ঘটনার সংবাদ পেয়ে কাশিমপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিদর্শন করে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয় বলে বাদিনী জানিয়েছেন।
এজাহার দায়েরে বিলম্বের কারণ হিসেবে বাদিনী উল্লেখ করেন, আহত ছেলের চিকিৎসা, হাসপাতালে অবস্থান এবং স্বজনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও পরামর্শের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে থানায় উপস্থিত হয়ে এজাহার দায়ের করা সম্ভব হয়নি।
বাদিনী বলেন, ঘটনাগুলো একই ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয়ে আসছে এবং বর্তমানে তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। বিশেষ করে তার মেয়ে আফরিন আক্তার হাবিবাকে অপহরণের পর অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখা এবং তাকে ভারতে পাচার ও হত্যার হুমকির কারণে তার জীবন ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এ ঘটনায় ১ থেকে ৬ নম্বর আসামি এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত এফআইআর রুজু, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং অপহৃত আফরিন আক্তার হাবিবাকে দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন বাদিনী।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
Leave a Reply