
এখনো অপেক্ষায় আছি, কবে আমার আছিয়ার খুনিদের ফাঁসি হবে। এদিকে আমার স্বামী মানসিক ভারসাম্যহীন। তারে সামলাব, নাকি রায় কার্যকর করার জন্য আদালতের বারান্দায় ঘুরব!’
বুকভরা আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন মাগুরায় আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা মামলার বাদী আয়েশা খাতুন। বিচারিক আদালতে মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে এক বছর। এতে প্রধান আসামি হিটু শেখ পান মৃত্যুদণ্ড। তবে হাইকোর্টে আপিলের ঘুরপাকে থমকে আছে গতি।
বুধবার মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে আছিয়াদের বাড়িতে যখন এ প্রতিবেদক পৌঁছান, তখন দুপুর। টিনের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে ছোট্ট করে গড়া আছিয়াদের ঘর, যার একটি কক্ষে থাকত তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া আছিয়া।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই সেই ঘর থেকে শোনা গেল দুজনের কথাবার্তা। ঘরের ভেতর থেকে একটু মুখ বাড়িয়ে আছিয়ার মা আয়েশা খাতুন জানতে চাইলেন পরিচয়। সাংবাদিক শুনেই কথা বলতে চাইলেন না। অনেক অনুরোধের পর বারান্দায় এসে বসলেন।
আয়েশা খাতুন বললেন, ‘অনেক বলা হইছে, কিন্তু এই এক বছর কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।
আমরা কেমন আছি, কিভাবে বাঁইচে আছি, কেউ জানতে চায়নি। আমরা যখন অপেক্ষা করতেছি আছিয়ার হত্যাকারীর কবে ফাঁসি হবে, তখন জেলে বসে সরকারি খাবার খাচ্ছে আসামি হিটু শেখ। এই অবস্থা একজন মা কী করে সহ্য করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আছিয়া মারা যাওয়ার পর অনেকে আসছিল, প্রতিশ্রুতি দিছিল। কিন্তু এখন কারো কাছে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার কথা বলেন আয়েশা। জানান, একটি সংগঠন থেকে তাদের একটি গাভি দেওয়া হয়েছিল। এখন সেটার দুধ বেচে চলে সংসার।
বলেন, ‘আর যা জোটে তাই খাইয়ে বাঁইচে আছি। সরকারের অনেক চাল-ডাল আছে, হিটু শেখকে খাওয়াক।’
আয়েশা বলেন, ‘এতদিনেও মামলার রায় কেন কার্যকর হচ্ছে না, আমরা বুঝতে পারছিনে। তার (হিটু শেখ) ফাঁসি দেখতে আমাদের আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে জানিনে। তার দুই ছেলে তো খালাস পেয়ে গেছে। আমার মনে হয় আরো দেরি হলে হিটু শেখও খালাস পেয়ে যাবে।’
আছিয়ার বোন ফাতেমা এখন নতুন সংসারে। তার পুরনো শ্বশুরবাড়িতে গিয়েই ২০২৫ সালের ৫ মার্চ রাতে ধর্ষণ-হত্যার শিকার হয় আট বছরের আছিয়া। দেশজুড়ে আলোচিত সেই ঘটনার পর অচেতন আছিয়াকে ঢাকা আনা হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য। এর আট দিনের মাথায় সারা দেশকে কাঁদিয়ে ঢাকার সিএমএইচে মারা যায় শিশুটি।
শিশু আছিয়ার মৃত্যুর পর উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। তোপের মুখে নারী নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তখনকার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তবে বিচারিক আদালতে দ্রুতগতিতে ফাতেমার শ্বশুর হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড হলেও এরপর মামলার আর অগ্রগতি নেই।
আয়েশা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আছিয়ারে হত্যার পর মেয়ে ফাতেমারে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাড়িতে নিয়ে আসি। স্বামীরে তালাক দেওয়াই। কিন্তু অভাবের তাড়নায় কী করব। আবার বিয়ে দিই। কারণ নিজেদেরই খাওয়া জোটে না। সেখানে মেয়েরে কিভাবে রাখব সংসারে।’
Leave a Reply