
শিশুদের পাশবিক নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যাকারীরা সাধারণত সাইকোপ্যাথিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। এদের মনোবৃত্তি অনেকটা সিরিয়াল কিলারদের মতো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচিত লোকদের মাধ্যমেই শিশুরা বিকৃত যৌনলালসার শিকার হচ্ছে। আর এই অপরাধীরা শিশুপর্ন দেখে বিকৃত রুচি তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রে মানসিকভাবে অসুস্থ ও মাদকাসক্তরা এ ধরনের অপরাধে বেশি সম্পৃক্ত। অপরাধবিজ্ঞানী এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয় ৭৫ শিশু। আর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় ২৩ শিশু। এর মধ্যে ৯ শিশুকে হত্যা করা হয়। বিকৃত লালসার এই দুর্বৃত্তদের নির্মম নির্যাতনে আছিয়া ও রামিসার মতো কোমলমতি শিশুরা অকালেই ঝরে পড়ছে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে প্রতিবেশীর পাশবিক লালসার শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা। মেয়েটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয় এবং লাশ কয়েক টুকরা করা হয়।
চলতি বছরেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল থেকে গলা কাটা অবস্থায় এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। এই শিশুকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে তারই প্রতিবেশী বাবু শেখ হত্যা করতে চেয়েছিল। শিশুটিকে দুর্গম পাহাড় থেকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু পরদিন ২ মার্চ রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটির মৃত্যু হয়। গত বছর মাগুরার শিশু আছিয়াকেও নির্মমভাবে তার পরিচিতজনেরা ধর্ষণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে। মাগুরার আট বছরের আছিয়া তার বোনের শ্বশুরবাড়ি ধর্ষণ ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। পরে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছিয়ার মৃত্যু হয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘যে ব্যক্তিরা এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায় তারা সাইকোপ্যাথিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। এরা বিশেষ ধরনের ব্যক্তিত্ব, যাদের কাজ হচ্ছে খুব ঠান্ডা মাথায় এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করা। আর এ রকম অপরাধ করে তারা এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ পায়। যাকে আমরা ব্যক্তিত্বের দূষণও বলতে পারি। এ অপরাধীরা খুব পরিকল্পনা করে নিখুঁতভাবে এমন অপরাধ করে, যা স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ধরনের কাজ তারা যত করে ততই এ অপরাধ করার ইচ্ছা বাড়তে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘এটি এক ধরনের মানসিক অবস্থা। তবে কোনো রোগ নয়। এ অপরাধীরা খুব ভালোভাবে যার ক্ষতি করবে তার সঙ্গে মিশে যাবে, কিন্তু তাকে বুঝতেই দেবে না যে তার ভিতর কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে। এদের মনোবৃত্তি অনেকটা সিরিয়াল কিলারের মতো।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘যখন একটি দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকে তখন এ ধরনের নির্মম অপরাধমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। এখন শিশু ধর্ষণের সঙ্গে ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদক অনেক বেশি সহজলভ্য। এতে বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। আবার পর্নোগ্রাফিও এখন হাতের নাগালে, যা মনুষের বিকৃত রুচি তৈরি করছে।’
তিনি বলেন, ‘রামিসার হত্যাকারীর স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী অপরাধী অনেক বেশি বিকৃত রুচির ছিলেন। এ কারণেই রামিসাকে লোকটি নৃশংসভাবে হত্যা করেন। অর্থাৎ অপরাধী মানসিকভাবে সুস্থ নন। লোকটির আগেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা ছিল। আগের অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় নতুন করে আবারও বড় ও বীভৎস অপরাধে জড়িয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা কমে আসায় এ ধরনের অপরাধে এখন জড়াচ্ছে অনেকে। তারা মাদকে ঝুঁকে বিকৃত যৌনতায় আসক্ত হচ্ছে। এরা ভয়াবহ, সহিংস ও বিকৃত যৌন আচরণ করছে।’
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘ছোট শিশুরা নির্যাতিত হলে তা অভিভাবকদের সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেয়। যখন কোনো শিশু বিকৃত যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তারা ঘটনাটি বলে দিতে পারে এই ভয়ে থাকে অপরাধীরা। এজন্য শিশুটিকে হত্যা না করলে ধরা পড়ার শঙ্কায় থাকে তারা। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তিরা এই বিকৃত যৌন নির্যাতন চালায়। শিশুরা এখন ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। এখন অপরাধীরা বিকৃত রুচির। এখন শিশুপর্নো দেখে এই বিকৃত রুচি তৈরি হচ্ছে। বিটিসিএলকে এই পর্নোসাইট বন্ধ করতে হবে।’
Like this:
Like Loading...
Related
Leave a Reply