
পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্পৃক্ততার তথ্য জানার কারণেই অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলামকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাকে ‘জঙ্গি’ সাজিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে দীর্ঘ চার মাসের বেশি সময় গুম রেখে নির্যাতন চালানো হয়। এ ঘটনায় সাবেক আইজিপিসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
স্বামীকে জঙ্গি বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে জেবুন্নাহারের ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় নির্যাতন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে এই জঘন্যতম হত্যা ও গুমের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বৃহস্পতিবার এ মামলার প্রধান আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) একেএম শহীদুল হককে গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে সরকারের বাছাই করা সেনা কর্মকর্তাদের পিলখানায় পোস্টিং দেওয়া হয়। সেই তালিকায় মেজর জাহিদেরও নাম ছিল। তিনি এতে আগ্রহী ছিলেন না; তাই যোগদান করেননি। তখন পিলখানায় জাহিদের কোর্সমেট শহীদ ক্যাপ্টেন মো. মাজহারুল হায়দারের পোস্টিং ছিল। ওই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের ওপর এক মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। ঘটনার দিন শহীদ ক্যাপ্টেন মাজহারুল জাহিদকে ফোনে বলেছিলেন, আমাদের সব অফিসারকে মেরে ফেলেছে।
কারা মেরেছে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন মাজহার বলেন, কিছু হিন্দিভাষী ব্যক্তি, যারা বিডিআর-এর পোশাক পরা ছিল। যাদের কখনোই পিলখানায় আগে দেখিনি। মেজর জাহিদ তখন বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন। ঘটনা শুনে তিনি হতভম্ব হয়ে ক্যান্টনমেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। জাহিদ পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। তিনি মাজহারুলের কাছ থেকে অনেক কিছুই জেনে গিয়েছিলেন। তাই হাসিনা সরকার তাকে টার্গেট করে নজরদারিতে রাখত।
অভিযোগ থেকে আরও জানা যায়, সেনাবাহিনীতে অযোগ্য অফিসারের পদোন্নতি এবং নানা বিশৃঙ্খলা জাহিদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি দেখলেন, চাটুকার ও অযোগ্য অফিসারদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি ২০১৫ সালে চাকরি ছেড়ে পরিবার নিয়ে উত্তরায় ভাড়া বাসায় উঠেন।
জঙ্গি নাটক সাজিয়ে হত্যা : চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর গোয়েন্দারা জাহিদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জাহিদ। বাসা বদল করে উত্তরা থেকে রূপনগরে চলে যান। কিন্তু হাসিনা সরকার জঙ্গি নাটক সাজিয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সেই মোতাবেক ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে জাহিদকে হাত বেঁধে বাসার নিচে নিয়ে যায় রূপনগর থানা পুলিশের একটি দল। এরপর নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়।
এর আগে রাত ১০টার দিকে আসামিরা জেবুন্নাহারকে তার দুই শিশুসন্তানসহ চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তখন জেবুন্নাহার জানতে চান, তার স্বামী কোথায়? পুলিশ তখন বলতে থাকে, তিনি ও তার স্বামী জঙ্গি, এই স্বীকারোক্তি না দিলে তাকেও তার স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। পরে পুলিশের কোনো একজন জানান, তারাই মেজর জাহিদকে হত্যা করেছে।
ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ: গত বছরের ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর পৃথক অভিযোগ করেন জেবুন্নাহার। অভিযোগে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) তৎকালীন প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, মিরপুর বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহমেদ, রূপনগর থানার তৎকালীন ওসি শাহীদ আলম, ডিসি ডিবি কৃষ্ণ পদ রায় ও রূপনগর থানা-পুলিশের তৎকালীন অজ্ঞাতনামা সদস্যদের আসামি করা হয়েছে।
প্রধান আসামি একেএম শহীদুল হককে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ নির্দেশ দিয়েছেন।
স্ত্রীর ওপর নির্মম নির্যাতন: জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহারকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। নেওয়া হয় মিথ্যা জবানবন্দি। একই সঙ্গে নিহত মেজর জাহিদের বিরুদ্ধে একটি এবং জেবুন্নাহারের বিরুদ্ধে ২টি সাজানো জঙ্গি মামলা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।
Leave a Reply