
সাতক্ষীরায় পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচার: ‘টেমি’ হাফিজ ও মাছুরাকে ঘিরে নতুন বিতর্ক, চুরি-ডাকাতির আতঙ্কে জনজীবন
নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মাননীয় ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি)সহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে দাখিল করা অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের সুনাম ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রচারিত ভিডিও বক্তব্য ও সংবাদকে পরিকল্পিত অপপ্রচার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সচেতন মহল ও স্থানীয়দের দাবি, মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়ে ভিডিও তৈরি করে এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুকে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের কথিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করতে চাইছেন। বিষয়টি নিয়ে জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। চুরি-ডাকাতির আশঙ্কায় জনজীবনে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
আইজিপিসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে দাখিল করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মিতুন, ডি-১ হাফিজুর রহমান, ডিবির অফিসার ইনচার্জ মো. নিজামুদ্দিন, কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. হাফিজুর রহমান, কালিগঞ্জ থানার এসআই কামাল হোসেন, এসআই সুদীপ, এসআই পিংকু, এএসআই রফিকসহ ৭/৮ জন পুলিশ সদস্য তাঁকে ডেকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এসআই কামাল হোসেন ও এসআই সুদীপ মহিলা পুলিশ সদস্যদের নিয়ে তাঁর ভাড়া বাসায় তল্লাশি চালান। এ সময় তাঁর বৈধভাবে ক্রয়কৃত একটি OPPO মোবাইল ফোন জব্দ করা হয় এবং তাঁকে আটক করে মিথ্যা মামলায় চালান করা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা অবৈধ আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তাঁকে হয়রানি, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন এবং ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
জানা গেছে, কালিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এবং জেলার আলোচিত মাদক, অস্ত্র ও ডাকাত চক্রের সদস্য ইয়ার আলী, বাহার আলী, রেজাউ ও রফিকুলের সহযোগী হিসেবে পরিচিত একাধিক মামলার আসাম ‘টেমি’ হাফিজুর রহমান (৪৮), পিতা: মৃত এলাইবাক্স গাজী, সাং: বাজারগ্রাম, থানা: কালিগঞ্জ অভিযোগ লিখে নিজে স্বাক্ষরে দাখিল করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর সহযোগী হিসেবে পরিচিত জেলার আলোচিত ইয়াবা ব্যবসায়ী ও ব্ল্যাকমেইলার ‘লেডি ডাকাত’ মোছা. মাছুরা বেগম (৩৫), স্বামী: ছুবাহান (কুখ্যাত চোর), পিতা: আবু বক্কার সিদ্দীক গাজী, সাং: চন্ডিপুর, থানা: শ্যামনগর, বর্তমান ঠিকানা: মঞ্জিতপুর, থানা ও জেলা: সাতক্ষীরা কে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
ওই অভিযোগে সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী এস. এম. নাসির উদ্দীনকেও জড়ানো হয়েছে। অভিযোগের জবাবে বলা হয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত নন। সততা, সুনাম, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সাংবাদিকতা এবং বৈধ ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে মাদক, চোরাচালান, সংঘবদ্ধ চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্যগত সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। এ কারণেই স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং নিজেদের বিরুদ্ধে চলমান আইনগত প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, পুলিশকে হয়রানি করা এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতেই এ ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে।
তাঁদের আরও দাবি, টেমি হাফিজ, মাছুরা খাতুন, ইয়াবা ব্যবসায়ী তানভীর এবং তাঁদের সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি ও অস্ত্র কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এসব কর্মকাণ্ড আড়াল করতেই দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৫ জুলাই রাতে সশস্ত্র ডাকাত দল মধুসূদন কর্মকারের বসতবাড়িতে প্রবেশ করে গৃহকর্তা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মারাত্মকভাবে আহত করার ঘটনায় কালিগঞ্জ থানায় এজাহার নং-০৪ (তারিখ: ০৬/০৭/২০২৫), পেনাল কোডের ৩৯৫/৩৯৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, উক্ত ঘটনার তদন্তকালে পুলিশি কলাকৌশল প্রয়োগ এবং মোবাইল প্রযুক্তির সহায়তায় মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। তদন্তে আরও জানা যায়, মামলার অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকার ওই আসামির কাছে রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা অজ্ঞাত স্থানে বিক্রি করা হয়েছে। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সাতক্ষীরা শহর থেকে মোছা. মাছুরা বেগম (৩৫)-কে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, শ্যামনগরের ভেটখালী এলাকার বাসিন্দা, কুখ্যাত চোর ছুবানের স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননী মাছুরার এর আগে ডজনখানেক বিয়ে হয়েছে। ছুবান একসময় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আহত হয়ে পঙ্গু হন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
এ ছাড়া মাছুরা ২০১৮ সালে শ্যামনগর বিআরটিসি কাউন্টার মালিক মতির সঙ্গে তাঁর দেবর, সুন্দরবন-ডাকাতদের জন্য বিপুল পরিমাণ ইয়াবা নিয়ে ভেটখালী এলাকা থেকে পুলিশের হাতে আটক হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে ২০২৩ সালে নিজ বাড়ি থেকে ইয়াবাসহ তাঁকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় শ্যামনগর থানায় দায়ের করা দুটি মাদক মামলার তথ্য রয়েছে—মামলা নং-৩১, তারিখ: ৩০/০১/২০২৩ এবং মামলা নং-০৬, তারিখ: ১০/১২/২০১৮।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাছুরা খাতুন ও টেমি হাফিজ দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের বিরুদ্ধে অজ্ঞান পার্টির সদস্য হিসেবে সক্রিয় থাকা, চুরি, ডাকাতি, ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য, ভুয়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তাঁরা বারবার আইনি সুবিধা পেয়েছেন এবং গ্রেপ্তারের পরও স্বল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগের বিষয়গুলো যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রতিবেদনটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও সংযুক্ত করা যেতে পারে।
Leave a Reply