
কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও পৌরসভা এলাকায় পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা নাগরিক এবং একজন স্থানীয় বাংলাদেশি রয়েছেন।
সোমবার (৬ জুলাই) রাত দেড়টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
উখিয়ায় নিহতরা হলেন—পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকের কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯), চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস; কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে একরাম (৭); এবং বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকের উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাত দেড়টার দিকে ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে পরিবারের ১০ সদস্য মাটিচাপা পড়েন। খবর পেয়ে উদ্ধারকারীরা কামাল হোসাইন, তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম ও তাদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা জীবিত উদ্ধার হলেও কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর কিছুক্ষণ পর রাত ২টার দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ওই ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রশিদের সাত বছর বয়সী ছেলে একরামের মৃত্যু হয়। পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন (উম্মে হাবিবা, তানজিনা আক্তার, মোহাম্মদ রিহান ও হারুনুর রশিদ) নিহত হন।
এদিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর (৫০) নামের এক স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে। জানা গেছে, ভোর ৪টার দিকে ছাত্তার ঘোনা এলাকায় একই পরিবারের ৩ সদস্য পাহাড়ধসে চাপা পড়েন। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন এবং স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা রাতভর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে হতাহতদের উদ্ধার করেন।
উখিয়ার রাজাপালং ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, নানা সতর্কতা ও প্রস্তুতির পরেও এ ধরনের পাহাড় ধসের মর্মান্তিক ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। তিনি সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
উখিয়ার ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) পরিদর্শক শুভেন্দু চ্যাটার্জি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ের পাদদেশে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে শরণার্থী শিবিরজুড়ে নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, রোববার সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েকদিনও জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের মধ্যে অন্তত আটটি ক্যাম্প পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ক্যাম্পে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালজুড়ে গড়ে ওঠা অস্থায়ী বসতিতে বসবাস করছেন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। বর্ষা মৌসুমে টানা ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
Leave a Reply